খাদ্য উৎপাদনে বাড়ছে খরচ

জলবায়ু সংকটে ইউরোপে বদলে যাচ্ছে চাষাবাদের পদ্ধতি

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়তে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ইউরোপের কৃষকরা।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়তে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ইউরোপের কৃষকরা। বিশেষ করে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোয় তীব্র খরা, দাবানল ও আকস্মিক বন্যায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

গ্রিসের আঙ্গুর খামারি স্টেলিওস বুটারিস বলেন, ‘আমি পেশা বদলাতে রাজি নই। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে কৃষিকাজ করতেন, আমরা সেভাবে আর করতে পারছি না।’

বুটারিসের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে কৃষিকাজ করে আসছে। কিন্তু জলবায়ু সংকটের কারণে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হচ্ছে। তার মতো মহাদেশটির হাজার হাজার কৃষক এখন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

আঙ্গুর ক্ষেতে সেচ ও জল সংরক্ষণে নতুন অবকাঠামো তৈরি করছেন স্টেলিওস বুটারিস। মাটির আর্দ্রতা বজায় ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জমিতে এখন বেশি গাছ লাগাচ্ছেন। এছাড়া উঁচু জমিতে চাষ করছেন এবং আঙ্গুরের এমন জাত খুঁজছেন, যা চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

তবে নতুন কৌশলের জন্য কৃষকদের বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। বুটারিস জানান, তিনি এরই মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো খরচ করেছেন এবং এর সঙ্গে আরো ২ লাখ ইউরো যোগের পরিকল্পনাও করছেন। অতিরিক্ত এ খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হবে। ফলে ভোক্তাদের খরচ বাড়বে।

ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) কৃষি ফসলের ক্ষতির পরিমাণ দুই-তৃতীয়াংশ বেড়ে ২ হাজার ৪৮০ কোটি ইউরো পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষ করে স্পেন, ইতালি ও গ্রিসে খরা পরিস্থিতি আরো নয় গুণ পর্যন্ত অবনতি হতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে ফসলের উত্তরমুখী স্থানান্তর দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত কিছু পানীয় কোম্পানি এখন যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ করছে। স্কটল্যান্ডের মতো শীতল অঞ্চলে ভুট্টা চাষ হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের কৃষকরা এখন শিমের মতো ফসল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, যা সাধারণত ব্রিটিশ আবহাওয়ায় সহজে হয় না। তবে জলবায়ু সংকট যত তীব্র হচ্ছে, অভিযোজন ততই কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।

দক্ষিণ ইউরোপের অনেক পারিবারিক খামার জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে। সলিড অলিভ অয়েল ব্র্যান্ডের সারা ভাচন বলেন, ‘আমরা দেখছি, অনেক কৃষিজমি পরিত্যক্ত হচ্ছে। মানুষ আর কৃষক থাকতে পারছে না।’

তিনি আরো জানান, ছোট কৃষকদের জন্য সেচ বা নতুন জাতের ফসল কেনা খুবই বড় বিনিয়োগ। এজন্য সরকারি সহায়তা পাওয়াও কঠিন।

গ্রিসে এরই মধ্যে অনেক ছোট কৃষক তাদের জমি ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন, কারণ চাষাবাদ করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। স্পেনের গুয়াদালকুইভির নদীর অববাহিকায় দেখা যাচ্ছে পানির স্বল্পতা। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে রূপান্তর হচ্ছে অনেক খামার।

রাবোব্যাংকের বিশ্লেষক ল্যামবার্ট ভ্যান হোরেন বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছর ইউরোপে প্রতি হেক্টরে কৃষিপণ্যের উৎপাদন আর বাড়বে না। এর অর্থ হলো পণ্যের দাম আরো বাড়বে, কারণ কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।’

জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় কৃষকদের এখন আরো বেশি ছায়াযুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউজ তৈরি করতে হচ্ছে। এসবও উৎপাদন খরচ বাড়ার আরেকটি কারণ। স্টেলিওস বুটারিস বলেন, ‘এর থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ অবশ্যই আছে এবং আমি দেখাতে চাই তা সম্ভব।’

আরও